মেঘের রাজ্য সাজেক

বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছোট বড় অনেক পাহাড় থাকলেও পাহাড়ের আধিক্য পার্বত্য চট্টগ্রামেই সর্বাধিক দেখা যায়। পার্বত্য চট্টগ্রাম রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবন নামক তিনটি জেলায় বিভক্ত। নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্ধর্য, পাহাড়, ঝর্না, বন, বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠি (আদিবাসী) এবং তাদের জীবনাচারন প্রভৃতি এই অঞ্চল কে পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত করেছে। এই অঞ্চলে ছোট বড় অনেক পর্যটন কেন্দ্র এবং পর্যটক দর্শনীয় আকর্ষণ রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি  পর্যটন কেন্দ্র হল সাজেক উপত্যকা বা সাজেক ভ্যালী।

মূলত সাজেক পর্যটন জেলা রাঙ্গামাটির অংশ হলেও এখানে যেতে হয় খাগড়াছড়ি জেলা দিয়ে এজন্য অনেকেই একে খাগড়াছড়ির অংশ মনে করে থাকেন। খাগড়াছড়ি হতে সরাসরি চাঁদের গাড়িতে করে, বা প্রাইভেট কার বা মাইক্রোবাসে করে সাজেক যাওয়া যায়। মোটর সাইকেল যোগেও যাওয়া যেতে পারে। যাবার পথে পড়বে মন জুড়ানো পাহাড়ের দৃশ্য, স্থানীয় বাজার এবং হাজাছড়ি ঝর্না।

সাজেকে থাকার জন্য আর্মি রিসোর্ট সহ স্থানীয় লোকজনের বিভিন্ন টোং ঘর রয়েছে। সেখানে অবস্থান করে রুম থেকেই পাহাড়ের সৌন্ধর্য উপভোগ করা যায়। স্থানীয় লোকজনের পরিচালনায় বেশ ভাল মানের হোটেল আছে যেখানে মিলবে সুস্বাদু আদিবাসী খাবার। আপনার পছন্দ মত খাবার রান্না করে দিবে তারা, চাইলে বার্বি কিউ করার সুযোগ রয়েছে।

পাহাড়ের কুয়াশা ভেদ করে নতুন দিনের আগমন অর্থাৎ সুর্যোদয় এক নৈসর্গিক আনন্দ দেয়, খুব ভোরে না উঠলে অবশ্য কুয়াশা আর সুর্যের খেলা দেখা মিস হয়ে যেতে পারে। ঠিক তেমনি সাজেকের সূর্যাস্তও অতি নয়োনাভিরাম। আর্মি হেলিপ্যাড থেকে দেখা যায় দুটোই। তবে যদি আপনি আরো বেশী সুন্দর দেখতে চান তবে যেতে হবে কংলাকের চুড়ায়। তেমনি চমৎকার সাজেকের সুর্যাস্ত, কল্পনার  চেয়েও আরো অনেক বেশী আধ্যাত্মিক এক অনুভুতি এনে দেবে, ফিরিয়ে নিয়ে যাবে বারবার সেখানে।

রাতের সাজেক এক অন্য অনুভুতি! ছোট ছোট ঘর গুলিতে অন্ধকারের মধ্যে আলোর খেলা এক অন্য জগতে নিয়ে যায়। চাঁদনী রাতে হেটে হেটে বন্ধুদের সাথে বা প্রিয় মানুষের সাথে রাতের সাজেক আপনাকে আজীবনের এক স্মরনীয় স্মৃতি প্রদান করবে।

বর্ষাকালে সাজেকের রাস্তায় মেঘের রাজ্য চলে! মনে করুন আপনি হেটে যাচ্ছেন, আপনার চারপাশে ভাসমান মেঘের দল। আপনার মাথা মেঘের ভেতর, অনেকটা স্বর্গীয় ব্যাপার। তবে সারাবছর এটা দেখা যায়না। সুউচ্চ পাহাড় চুড়া, নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য, আদিবাসী নৃগোষ্ঠী ইত্যাদি আকর্ষনীয় হলেও সাজেকের অন্যতম আকর্ষণ হল এই পাহাড়ের বুকে ভাসমান মেঘের লীলা। এই মেঘের খেলা দেখতে প্রতি বছর হাজার হাজার দেশী পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন।

কুয়াশা কমবেশী সারাবছর থাকলেও শীতের কুয়াশার চাদরে ঢাকা সাজেক সত্যিই অতুলনীয়। পাহাড়ের দিকে তাকালে মনে হবে কিছুই নেই ওখানে কেবল নরম কুয়াশার আস্তরন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে কুয়াশা কমে যায় আবার বিকেল হতেই আস্তে আস্তে গুটি গুটি পায় ঘিরে আসে সেই চির পরিচিত কুয়াশা। তবে সাজেকের কুয়াশার সৌন্ধর্য আপনার কল্পনাকেও হার মানাবে।

যাবার পথের হাজাছড়া ঝর্না এবং সাজেকের রিসং ঝর্না বেশ চমৎকার। তবে বর্ষাকালেই ঝর্নার সৌধর্য অনেক বেশী উপভোগ্য হয়ে ওঠে।

পুরো সাজেক সেনাবাহিনী কতৃক নিয়ন্ত্রিত হবার ফলে নিরাপত্তার কোন চিন্তাই নেই এখানে, আর স্থানীয় লোকজন খুবই বন্ধুত্বপূর্ন। কোন সমস্যা বা রিস্ক ছাড়াই নিরাপদে ঘুরে আসতে পারেন সাজেক। যদিও ইদানীং কালে অতিরিক্ত পরিমান স্থাপনা তৈরীর ফলে প্রাকৃতিক সৌন্ধর্যে কিছুটা ভাটা চোখে পড়ে। তবে যদি আপনি প্রথম বার যাচ্ছেন, এমন হয় তবে আপনার মন ভরে যাবেই।

2150cookie-checkমেঘের রাজ্য সাজেক

Leave a Reply